অনলাইনঅপরাধকালিগঞ্জসাতক্ষীরা জেলা

কালিগঞ্জের ৩৩ মাসেও শেষ হয়নি দুই প্রধান সড়ক ও ব্রীজ :নির্বাচনী নিরাপত্তা ও জনজীবনে ভয়াবহ শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার প্রধান দুটি সড়ক ও সংশ্লিষ্ট দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রীজ দীর্ঘ ৩৩ মাস ধরে কার্যত অচল। তারালী ও উজিরপুর ব্রীজ এবং কালিগঞ্জ-বাঁশতলা সড়কের দেড় কিলোমিটার অংশের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় পুরো উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এই দুটি ব্রীজ ব্যবহার করতে না পারায় কালিগঞ্জ থেকে আশাশুনি বা বাঁশতলা হয়ে সাতক্ষীরায় যেতে অন্তত ২০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরেতে হচ্ছে। এতে শ্যামনগর, আশাশুনি, দেবহাটা, কালিগঞ্জসহ সাতক্ষীরা জেলার প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

নির্ধারিত সময় পেরিয়ে এক বছর, নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি। নথিপত্র অনুযায়ী প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ব্রীজ দুটির নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। প্রকল্প ঝুলে থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ও অনিয়ম আড়াল করতে নানা কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে মিলেছে উদ্বেগজনক চিত্র, সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে-নির্মাণস্থলে নেই প্রয়োজনীয় শ্রমিক, নেই নিয়মিত কাজের তৎপরতা। পড়ে থাকা লোহার গার্ডার ও রডে ধরেছে মরিচা, যা নির্মাণমান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। অভিযোগের সুরে আঙ্গুল তুলেছে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের দিকেও।

উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত ব্যাখ্যা বা সময়ভিত্তিক কাজের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। লোক দেখানো কাজ হয়, তারপর সব উধাও হয়ে যায় এমন অভিযোগ তারালী বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারী রবিউল, এবাদুল ও সোহেল বলেন, “মাঝে মাঝে লোক দেখানো কাজ হয়। এরপর মাসের পর মাস কাউকে দেখা যায় না। প্রশ্ন করলে কেউ দায় নেয় না। অথচ ক্ষতিটা আমাদেরই।”
তবে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সময় সামনে থাকলেও এই সড়ক ও ব্রীজ দুটি এখন নির্বাচনী নিরাপত্তার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বর্তমানে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার আলী সোহাল জুয়েল স্পষ্ট করে বলেন, “এই দুটি ব্রিজ নির্বাচনী নিরাপত্তার বড় বাধা। বিকল্প রাস্তা খুব খারাপ এবং সময়ও অনেক বেশি লাগে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে।”
ব্রীজ না থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো যেতে পারে না। রোগী নিয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”
কালিগঞ্জ টু বাঁশতলা ও কালিগঞ্জ টু আশাশুনি সড়ক ৩৩ মাস ধরে অচল এ বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ জাকির হোসেনের কাছে একাধিকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি এড়িয়ে যান। প্রশ্নের মুখে শুধু বলেন- পাশে কাঠের ব্রীজ সচল আছে সেখান মাহিন্দ্রা ও অটো রিক্সা চলাচল করতে পারবে।
তবে সরেজমিন চিত্র তার বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। একাধিক প্রশ্নের মুখে প্রকল্প। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারকে কেন কালো তালিকাভুক্ত করা হয়নি? বিল পরিশোধ হয়ে থাকলে কোন ভিত্তিতে? তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এতদিন কী করেছেন? তারা কি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে?
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে এই চরম অব্যবস্থাপনা যোগাযোগ সমস্যা ছাড়িয়ে প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে-উপজেলা নির্বাহী অফিসার কি এর দায় নেবেন?
সচেতন মহলের মতে, দ্রুত দুদকের মাধ্যমে তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে প্রকল্পটি আরও অনিশ্চয়তায় ডুবে যাবে। প্রশ্ন একটাই-এই অবহেলার দায় কে নেবে? নাকি নির্বাচন শেষ হলেই সব ধামাচাপা পড়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *