কৃষিতালাসাতক্ষীরা জেলা

তালায় পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান ও উঠান বৈঠক

বিশেষ প্রতিনিধি: পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে খামারিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে উঠান বৈঠক, টিকাদান ও স্বল্পমূল্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি। সোনালী স্বপ্ন সমাজ কল্যাণ সংস্থার আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় খামারি, সংশি¬ষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গবাদি পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উৎপাদিত টিকাবীজ ক্রয়, বাস্তবায়ন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

জাগো নারী প্রগতি সংস্থার উদ্যোগে ও সোনালী স্বপ্ন সমাজ কল্যাণ সংস্থার বাস্তবায়নে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে তালা উপজেলার কাশিপুর হাইস্কুল মাঠে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে তালা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাছুম বিল¬াহের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. গোলাম হায়দার।

তিনি বলেন, “দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে শক্তিশালী করতে হলে মাঠপর্যায়ে পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। নিয়মিত টিকাদান ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খামারিরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও দুধ ও মাংস উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”

ডা. মো. গোলাম হায়দার আরও বলেন, “প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি, আর এ খাতের সুরক্ষা শুরু হয় পশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে। নিয়মিত টিকাদান ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা না হলে খামারিরা বারবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। সরকারিভাবে উৎপাদিত মানসম্মত টিকাবীজ মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। খামারিরা সচেতন হলে পশুর রোগ কমবে, উৎপাদন বাড়বে এবং দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণ সহজ হবে। এর ফলে পরিবারভিত্তিক আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ জীবনে স্থিতিশীলতা আসবে। আমরা চাই, প্রতিটি খামার নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনার আওতায় আসুক।”

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীর ও প্রকল্প পরিচালক মো. তায়েজুল ইসলাম। সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীর বলেন, গবাদি পশুর বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে উৎপাদিত টিকাবীজ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে পশু মৃত্যুর হার কমবে এবং খামারিদের আর্থিক ক্ষতি উলে¬খযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম, সাতক্ষীরার সিনিয়র সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন এবং কাশিপুর বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজিজুল হক। তারা খামারিদের সংগঠিত হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে পশুপালনকে আরও লাভজনক করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সোনালী স্বপ্ন সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সুমন্ত মজুমদার। তিনি বলেন, “গ্রামীণ খামারিদের পাশে দাঁড়িয়ে পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য। সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”

এ সময় বক্তারা বলেন, গবাদি পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়বে, খামারিদের আর্থিক সক্ষমতা উন্নত হবে এবং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা নিয়মিত টিকাদান, পরিচ্ছন্ন খামার ব্যবস্থাপনা ও সময়মতো পশু চিকিৎসা সেবা গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।

উঠান বৈঠকে অংশগ্রহণকারী খামারিরা পশুর বিভিন্ন রোগ, প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে সরাসরি পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ পান। এতে খামারিদের মধ্যে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি পশুপালন নিয়ে তাদের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাসও আরও দৃঢ় হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. তায়েজুল ইসলাম বলেন, “গবাদি পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু খামারিদের ব্যক্তিগত লাভ নয়, এটি দেশের সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নিয়মিত টিকাদান ও সময়মতো পশু চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগের ঝুঁকি কমবে, উৎপাদন বাড়বে এবং খামারিদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।”

অনুষ্ঠানের অতিথি জাগোনারী প্রগতি সংস্থার উপ-পরিচালক সুচিত্রা রাণী বলেন, “গ্রামীণ নারীদের অনেকেই গবাদি পশু পালনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকলেও তারা এখনও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত। এ ধরনের উঠান বৈঠক ও টিকাদান কর্মসূচি নারীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হলে পরিবারের আয় বাড়বে এবং নারীদের আর্থিক সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই পশুপালনে আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করুক।”

অনুষ্ঠানে খামারী লতা রাণী বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে পরিচিত গবাদি পশু খাতের টেকসই উন্নয়ন ও খামারিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে নেওয়া হয়েছে সময়োপযোগী উদ্যোগ। পশুর রোগ প্রতিরোধ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খামারিদের সচেতনতা জোরদার করতে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় আয়োজন করা হয়েছে উঠান বৈঠক, টিকাদান ও স্বল্পমূল্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি। সরকারি দপ্তরের তত্ত্বাবধানে এবং বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচি স্থানীয় খামারিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *