অনলাইনআশাশুনিকালিগঞ্জতালারাজনীতিসাতক্ষীরা জেলা

সাতক্ষীরা-৩এ স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম: দ্বন্দ্ব ধন্দ্বে ভোটের অঙ্ক

গাজী হাবিব: অবশেষে সকল জল্পনা- কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি–কালিগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির জনপ্রিয় নেতা ডা. শহিদুল আলম।

সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) বিকেলে সাতক্ষীরা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই এলাকায় গুঞ্জন চলছিল- ডা. শহিদুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে তার জনপ্রিয়তা, চিকিৎসক হিসেবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকেই তাকে দলীয় মনোনয়নের দাবিদার হিসেবে দেখছিলেন। সোমবার মনোনয়ন জমার মধ্য দিয়ে সেই গুঞ্জন বাস্তব রূপ নেয়।

অন্যদিকে, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী আলাউদ্দীনকে আগেই কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সাতক্ষীরা-৩ আসনে শুরু থেকেই আলোচনা ও বিতর্ক চলছিল। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে স্থানীয় বাস্তবতা ও জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে দলীয় শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে ভিন্নমুখী রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হতে শুরু করে।

ডা. শহিদুল আলমের পক্ষে দলীয় মনোনয়ন দাবিতে তার অনুসারীরা টানা ১৭ দিন ধরে মিছিল, সভা ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এই আন্দোলন সাতক্ষীরা-৩ আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং বিষয়টি জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় আসে। তবে আন্দোলনের পরও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন না আসায় ডা. শহিদুল আলম শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলীয় রাজনীতিতে স্থানীয় নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ও কেন্দ্রের একক সিদ্ধান্তের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় ডা. শহিদুল আলমের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি তার প্রার্থিতাকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়। তার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় পার্টি থেকে সাতক্ষীরা-৩ আসনে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহাদাত হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সচিব আবু মাসুদ, জেলা জাসাস এর সাবেক আহবায়ক এড. এখলেছার রহমান বাচ্চু, নলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মিলন কুমার সরকার এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মীর্জা ইয়াছিন আলীসহ অনেকে। এই উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ডা. শহিদুল আলমের পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটি বিস্তৃত সমর্থনবলয় গড়ে উঠতে পারে।

সমালোচকদের মতে, ডা. শহিদুল আলমের স্বতন্ত্র প্রার্থিতা সাতক্ষীরা-৩ আসনে ভোটের হিসাবকে জটিল করে তুলবে। এতে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকে বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হলেও একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রিয়তা ও বহুদলীয় সমর্থনের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন। বিশেষ করে আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার গ্রামীণ ও আধা-শহুরে ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বলেন- বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে বিভাজন সৃষ্টি করতে একটি চক্র কেন্দ্রকে ভুল তথ্য সরবরাহ করে জেলার সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় নেতা ডা. শহিদুল আলমকে মনোনয়ন বঞ্চিত করা হয়েছে। যা সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি। এজন্য স্থানীয় জনসাধারণ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের অনুরোধে তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হচ্ছে।

কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন- ডা. শহিদুল আলম সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় আজ এ পর্যন্ত এসেছেন। তিনি নিজে আসেন নি। তাকে সাধারণ মানুষই এখানে নিয়ে এসেছেন। এজন্য তিনি সাধারন মানুষের মর্যদা অক্ষুন্ন রাখতে দলের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিবাচনে অংশ গ্রহণ করছেন। তিনি আরো বলেন- আমরা দলীয় পদের চিন্তা না করেই তার জন্য কাজ করেছি। পদের ভয় আমাদের নেই। সাধারণ মানুষ আমাদের সাথে আছে। ইনশাআল্লাহ এ নির্বাচনে আমরা জয়ী হবো।

ডা. শহীদুল আলম বলেন- জেলার অবহেলিত জনপদ আশাশুনি ও কালিগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা আজ আমাকে এই নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধ্য করেছে। আমি সাধারণ মানুষের দাবীকে উপেক্ষা করতে পারিনি। যে কারণেই হোক দল আমাকে মনোনয়ন দেয়নি। কিন্তু তৃণমূলের মানুষ আমাকে অগ্রগামী করেছে। ইনশাআল্লাহ আমি মানুষের আস্থা এবং ভালোবাসা নিয়েই জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবো।

সব মিলিয়ে, ডা. শহিদুল আলমের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়া সাতক্ষীরা-৩ আসনের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কেন্দ্রীয় দলীয় সিদ্ধান্ত বনাম স্থানীয় জনসমর্থনের দ্বন্দ্ব, স্বতন্ত্র প্রার্থীর উত্থান এবং বহুমুখী রাজনৈতিক সমীকরণ- সবকিছু মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে এই আসনটি যে অন্যতম আলোচিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা বলাই যায়।

উল্লেখ্য, এই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মুহাদ্দিস রবিউল বাশার ২৮ ডিসেম্বর জেলা রিটানিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *