জলবায়ু অভিযোজনের ভালো অনুশীলন বিনিময়ে খুলনায় আঞ্চলিক মিডিয়া সম্মেলন
মাসুদ পারভেজ: খুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সফল অনুশীলন গণমাধ্যমের মাধ্যমে তুলে ধরার লক্ষ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ের একটি মিডিয়া সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (২৮ ডিসেম্বর ২০২৫) সকাল ১১টায় নগরীর সিএসএস আভা সেন্টারের হলরুমে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
টিয়ারফান্ড ও এডুকো বাংলাদেশের অর্থায়নে এবং বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবের সাথে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন দুর্বল মানুষের মোকাবিলা করার ক্ষমতা জোরদার করা (স্কোপ)” প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত অভিযোজন কৌশল ও সফলতার গল্প তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের প্রকল্প অংশগ্রহণকারী শুক্কুরি রাণী মন্ডল ও স্বপ্না রাণী মন্ডল তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি ব্যাপকভাবে মারা যাচ্ছে, ফলে জীবিকায় বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়।
শুক্কুরি রাণী মন্ডল বলেন, “আমাদের এলাকায় এখন লোনা আর লোনা। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি টিকছে না। স্কোপ প্রকল্প থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়ে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দুইটি ভেড়া কিনে পালন শুরু করি। এক বছরের মধ্যেই ভেড়ার সংখ্যা বেড়ে ৭টিতে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, একটি ভেড়া বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে বাড়িতে অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করেন এবং এতে ভালো ফলন পেয়েছেন। তার এই উদ্যোগ দেখে এলাকার অনেক মানুষ নতুনভাবে উৎসাহিত হচ্ছেন।
স্বপ্না রাণী মন্ডল বলেন, এক সময় অন্যের কাপড় সেলাই করে সংসার চলত। স্কোপ প্রকল্প থেকে সহায়তা পেয়ে নিজেই কাপড় কিনে ব্যবসা শুরু করেছি। এখন নিয়মিত লাভ হচ্ছে।
পাশাপাশি তিনি বাড়িতে বালতি ও বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করেছেন। পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারে সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন। তিনি জানান, বর্তমানে তার ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। “স্কোপ প্রকল্প আমার জীবনের স্কোপ তৈরি করে দিয়েছে,-বলেন তিনি।
শুক্কুরি রাণী ও স্বপ্না রাণী মন্ডল বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব না হলেও অভিযোজন ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ালে ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক কমানো যায়। টিয়ারফান্ড, এডুকো বাংলাদেশ ও বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠনের সহায়তায় তারা লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, মাটির ক্ষয় এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের সঙ্গে টিকে থাকার কৌশল শিখেছেন।
সম্মেলনে আরও জানানো হয়, স্কোপ প্রকল্পের আওতায় গঠিত সি-ডি-ডব্লিউ-জি (কমিউনিটি ডিজাস্টার ওয়ার্কিং গ্রুপ) নামে ৩০ সদস্যের একটি দল নিয়মিত মাসিক সভা করে এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে থাকে। এসব সমস্যা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরার ফলে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
তাদের তথ্য ও উদ্যোগের ভিত্তিতে ৫টি সাইক্লোন শেল্টারে সোলার ব্যবস্থা ও সুরক্ষা কর্ণার স্থাপন, দুটি ছোট বেড়িবাঁধ সংস্কারসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে।
সম্মেলনে স্কোপ প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম ও অর্জন নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন করেন বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক জান্নাতুল মাওয়া। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (ডিআরআর) শেখ শাওন আহমেদ সোহাগের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক, সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম টুটুলসহ ২৪ জন সাংবাদিক এবং বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এসময় সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করলে শুক্কুরি রাণী মন্ডল ও স্বপ্না রাণী মন্ডল তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন।

