আশাশুনিকলারোয়াকালিগঞ্জতালাদেবহাটারাজনীতিলিডশ্যামনগরসদরসাতক্ষীরা জেলা

জ্বালানি সংকটে সাতক্ষীরার পেশাজীবীরা চরম বিপাকে

গাজী হাবিব: জ্বালানি তেলের চলমান সংকটে সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন কোম্পানী- প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ক্ষুদ্র চাকরিজীবীরা। ৭-৮ ঘন্টার মতো দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করা যেমন তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি পেশাগত দায়িত্ব ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করাও হয়ে উঠেছে প্রায় অসম্ভব।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (০২ এপ্রিল) সকাল ৯টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার একটি ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, পেট্রোল সরবরাহ করা হচ্ছে মাথাপিছু মাত্র ৫০০ টাকার। সকাল থেকেই সেখানে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। তবে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

তবে শ্যামনগর উপজেলার একটা ফিলিং স্টেশনে জ্বালানী তেল সংগ্রহের নিয়মটা ভিন্নভাবে ধরা পড়েছে গণমাধ্যমের কাছে। দেখা গেছে সকাল ৮ টা হতে ১০ টা পর্যন্ত জরুরি পরিসেবা- প্রশাসন, শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি/বেসরকারী সংস্থায় কর্মরতরা তেল পাচ্ছে। তারপর সাধারণ মানুষকে দেয়া হচ্ছে।

এদিকে, জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রতিদিন দূরবর্তী এলাকা থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিক্ষক সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে গণমাধ্যমকর্মীদের দুর্ভোগ আরও বেশি। সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত জেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। দুর্ঘটনা, দুর্যোগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো তাদের পেশাগত দায়িত্বের অংশ। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক সাংবাদিকই সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। এতে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তারা।

এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (এসআর)দের প্রতিদিন ৪ থেকে ৫টি মোকাম ঘুরতে হয়। প্রত্যন্ত এলাকার এসব মোকামে যেতে একজন এসআরকে দৈনিক কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পথ মোটরসাইকেলে অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের অনেকেই নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।

অভিযোগ উঠেছে, ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালকদের একটি অংশ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করছে। পরে তারা গোপনে এসব তেল গ্রামাঞ্চলে বেশি দামে বিক্রি করছে। ফলে প্রকৃত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক, সাংবাদিক ও অন্যান্য চাকরিজীবীরা তেল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকর্মী জিএম আমিনুল ইসলাম দাবি জানিয়ে বলেন, জরুরি ও জনসেবামূলক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কথা বিবেচনা করে সাংবাদিক, বিভিন্ন কোম্পানীতে কর্মরত এসআর, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স চালক, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত এবং জনপ্রতিনিধিসহ কয়েকটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা উচিত। এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ পাম্প মালিক সমিতির কাছে জোর দাবি জানান।

অপরদিকে, বাংলাদেশ ট্যাংকলরী ওনার্স এসোসিয়েশন খুলনা বিভাগীয় কমিটি, খুলনার নির্বাহী সদস্য শেখ আমানত আলী স্বাক্ষরিত একটি জরুরী নোটিশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে খুলনা বিভাগের সকল ফিলিং ষ্টেশন মালিকদের অবহিত করে স্পষ্ট ভাবে লেখা হয়েছে- বৈশ্বিক সমস্যায় সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানী তেল সংকট চলাকালিন ফিলিং ষ্টেশন থেকে ‘পাম্পে তেল মজুদ থাকা সাপেক্ষে জরুরী সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, পুলিশ প্রসাশন ও সাংবাদিক কর্মীদের আলাদা লাইন করে অথবা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচয়পত্র প্রদর্শন পূর্বক জ্বালানী তেল সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত সমিতি কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জ্বালানী তেল সরবরাহ করার জন্য সকল ফিলিং ষ্টেশন মালিকদের অনুরোধ করা গেল।

সচেতন মহলের মতে, খুলনার মতো সাতক্ষীরাতেও সংকটের এই সময়ে জ্বালানি তেলের সুষম ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে জনসেবামূলক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ বা বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল সরবরাহ করা হলে অনেকটাই ভোগান্তি কমবে।

ভুক্তভোগীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ এবং সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষুদ্র চাকরিজীবী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কর্মীরা আন্দোলনে নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুধু কালিগঞ্জ নয়, সাতক্ষীরার সদর উপজেলা, তালা, কলারোয়া, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার সবগুলো পাম্পে একই চিত্র দেখা গেছে। প্রখর রোদ ও তীব্র ভ্যাপসা গরমে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের কারণে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, কিছু কিছু ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বাইকার জ্বালানী তেল সংগ্রহের জন্য ঘোষনাকৃত নির্দিষ্ট দিনের আগের রাত্রে মশারি টাঙিয়ে ফিলিং স্টেশনে রাত পার করছেন। যা একজন মানুষের জন্য চরম অবমাননাকর।

এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের অপব্যবহার ও কালোবাজারি বন্ধ করা এবং জরুরি পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *