অনলাইনঅপরাধআইন আদালতশ্যামনগরসাতক্ষীরা জেলা

নারীর নিরাপত্তায় ঈশ্বরীপুরে গণজাগরণ ও সামাজিক অঙ্গীকার

বিশেষ প্রতিনিধি: জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবন পর্যন্ত নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের অর্ধসহস্রাধিক নারী-পুরুষ। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সাসা টুগেদার অ্যাকশন’ ধাপের কমিউনিটি উদযাপন ও গণসমাবেশ।
বেলা ১১টা থেকে ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আগে শত শত নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোভাযাত্রায় নারী অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা রোধ, শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে নানা ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন ও ¯ে¬াগান তুলে ধরা হয়। আয়োজকদের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

তিন বছর ধরে ওয়ার্ল্ড রিনিউ-এর সার্বিক সহায়তায় পরিচালিত এই কর্মসূচি এবছর আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালীভাবে আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজক সংগঠন ফেইথ ইন এ্যাকশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর তীমন বাড়ৈ সমগ্র আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্যামনগর উপজেলা ওসিসি অফিসার প্রণব বিশ্বাস বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যাও বটে। সহিংসতা বন্ধ করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মানসিকতা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নারীর প্রতি সম্মানবোধ ধারণ করে, তাহলেই আমরা একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং যুব সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

স্বাগত বক্তব্যে ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি. এম শফিউল আলম বলেন, পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। পরিবারে যদি নারী ও শিশুরা নিরাপদ না থাকে, তাহলে সমাজ কখনোই শান্তিপূর্ণ হতে পারে না। তাই পরিবার থেকেই সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সীমান্ত ব্যাংক শ্যামনগর শাখার ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে সহিংসতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউপি সদস্য ফরিদা পারভিন তার বক্তব্যে বলেন, গ্রাম পর্যায়ে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা এখনও উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগী নারীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য সামাজিকভাবে সহায়তাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।

আলোচনা সভার পাশাপাশি দিনব্যাপী আয়োজনে সচেতনতামূলক নাটক, গান, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশন করা হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে নারীর অধিকার, পারিবারিক সহিংসতার ক্ষতিকর দিক এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে উপস্থিত জনসাধারণকে সচেতন করা হয়। এই আয়োজনে অংশ নেন অনুভূতি বৈদ্য, জবা সরকার, ভাদুরী মন্ডল ও জয়শ্রী মন্ডল, যাদের পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে গভীর আবেগ ও উপলব্ধির জন্ম দেয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত, গীতাপাঠ ও বাইবেল পাঠ করা হয়। ইমাম মো. আশরাফুজ্জামান বাবলু, পুরোহিত দিলীপ কুমার হালদার এবং সিআরসি প্রকল্প ব্যবস্থাপক মিল্টন বাড়ৈ নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ থেকে শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা তুলে ধরেন। এতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শমুয়েল সাংমা, যিনি ধারাবাহিকভাবে অতিথিদের বক্তব্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও আলোচনা সভা পরিচালনা করেন।

এদিকে ‘সাসা টুগেদার অ্যাকশন’ ধাপের কমিউনিটি উদযাপন অনুষ্ঠানের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে আয়োজক সংগঠন ফেইথ ইন এ্যাকশনের নির্বাহী পরিচালক নৃপেন বৈদ্য গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে জরুরি বার্তা প্রদান করেন। তিনি বলেন, সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন। গণমাধ্যমের সহযোগিতা ছাড়া এই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

আয়োজকদের মতে, এই ধরনের কর্মসূচি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একটি সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে।

দিনব্যাপী এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের মানুষ নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যা একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে ফেইথ ইন এ্যাকশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর তীমন বাড়ৈ বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সামাজিক ঐক্য ও সচেতনতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলেই সহিংসতামুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে। এই আন্দোলনকে আমরা একটি স্থায়ী সামাজিক অঙ্গীকারে রূপ দিতে চাই।
চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি সিনিয়র সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। গণমাধ্যম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো নির্যাতিতদের কণ্ঠ তুলে ধরা এবং সমাজকে সচেতন করা। প্রতিটি সহিংসতার ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সামাজিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রয়োজন। নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো সমাজই প্রকৃত উন্নতির পথে এগোতে পারে না। তাই সহিংসতার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের এই সম্মিলিত অঙ্গীকার শুধু একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি মানবিক সমাজ গড়ার চলমান আন্দোলন। ঈশ্বরীপুরের নারী-পুরুষের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ প্রমাণ করে সচেতনতা, সাহস ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। সহিংসতামুক্ত, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ গড়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *