অনলাইনআইন আদালততালালিডসদরসাতক্ষীরা জেলা

ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কেবল আদালত নয়, সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে- নজরুল ইসলাম

বিশেষ প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেছেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কেবল আদালত নয়, সমাজের প্রতিটি সেক্টরকে একসাথে কাজ করতে হবে। যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে আমি সকলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে আগ্রহী। সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু ঘটনার পর নয়, ঘটনার আগেই সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরী। একজন ভিকটিম যেন যথাযথ আইনি সহায়তা পায়, সেজন্য আলামত সংগ্রহের বিষয়ে শুরু থেকেই সচেতন হতে হবে। আইন সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব বাস্তবায়নে বিচার বিভাগ সবসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকাল ১১টা থেকে সারাদিনব্যাপী সাতক্ষীরা জেলার মোজাফফর গার্ডেন অডিটরিয়ামে আইনী সহায়তা সহজ করতে জেলা লিগ্যাল এইড বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

সভাপতির বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, লিগ্যাল এইড কার্যক্রম মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় অপরিহার্য। সমাজে সহিংসতা ও অন্যায় কমাতে হলে নৈতিকতা, মানবিকতা ও আইনের শাসন এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সাতক্ষীরায় সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের আইন সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় উঠে আসে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ। ন্যায়বিচারের পথে প্রান্তিক মানুষের বাধা দূর করতে করণীয় বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয় এই আয়োজনে। সহিংসতা প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির অঙ্গীকারে একত্রিত হন জেলার গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ব্যক্তিত্বগণ। মানুষের আস্থার জায়গা শক্ত করতে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ রূপরেখাও আলোচনায় স্থান পায়। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের আইন সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে সাতক্ষীরায় এ জনসচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের যৌথ আয়োজনে সাতক্ষীরায় লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।

মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন সিনিয়র চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, লিগাল এইড সম্পর্কে অনেক মানুষ এখনও জানেন না। আদালত ও প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভুক্তভোগীরা যদি শুরুতেই সঠিক তথ্য ও সহায়তা পান, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়। আইন সহায়তা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রণব কুমার হুই বলেন, বিচারপ্রাপ্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভয় ও অজ্ঞতা। লিগাল এইড কার্যক্রম সেই ভয় কাটাতে সহায়তা করছে। প্রান্তিক মানুষের কাছে আইনের ভাষা সহজ করে পৌঁছে দিতে পারলেই এ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।

অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ গৌতম মল্লিক বলেন, ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের আস্থা অর্জনই হলো প্রকৃত বিচার। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সেই আস্থা তৈরিতে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে সমাজে শিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, যা অত্যšত্ম উদ্বেগজনক। এটি কমাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে একসাথে কাজ করতে হবে। শিশুদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিনুর চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম পুলিশের কাজকে আরও গতিশীল করতে সহায়তা করছে।

সভাটির সার্বিক সঞ্চালনায় ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার শিল্পী শর্মা। তিনি বলেন, আইন সহায়তা যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সর্বাত্মকভাবে মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। এটাই আমাদের লক্ষ্য। নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু নির্যাতন ও সামাজিক অন্যায়ের বিরম্নদ্ধে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি।

মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা লিগ্যাল এইড কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ, তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করেন। সভা শেষে সভাপতির পক্ষ থেকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হয়।

মতবিনিময় সভাটি শেষ হয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, লিগ্যাল এইড কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে আরও বিস্তৃত হলে প্রান্তিক মানুষ আইনের সুরক্ষা সহজেই পাবে। সহিংসতা প্রতিরোধে আগাম সচেতনতা সৃষ্টি ও দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত উদ্যোগই পারে সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করতে। সভায় উত্থাপিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে ন্যায়বিচারের পথ আরও সুগম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

এছাড়া সভায় ‘সুফাসেক’ প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরার পাশাপাশি শিশুদের আইনি অধিকার সুরক্ষায় আসক-এর কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরার জিপি অ্যাড. অসীম কুমার মন্ডল, বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ নয়ন বিশ্বাস, বিজ্ঞ চিফ লিগ্যাল এইড অ‌ফিসার মোঃ মোস্তা‌ফিজুর রহমান, আসক প্যানেল অ্যাড. মোঃ মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু, উত্তরণ সংস্থার লিগ্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাড. মুহা মুনিরুদ্দীন, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জি, এটিএন বাংলা সাতক্ষীরা প্রতিনিধি এম. কামরুজ্জামান, লিগ্যাল এইড পর্যবেক্ষক সদস্য সাকিবুর রহমান বাবলা, সুশীলন সংস্থার সহকারী পরিচালক জিএম মনিরুজ্জামান, আসক’র শিশুদল সদস্য করিমন নেছা শান্তা ও জিএম তানজীম রিয়াদ প্রমুখ।

এসময় জেলা বিচার বিভাগের বিজ্ঞ সিভিল জজ, পুলিশ প্রশাসন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তার, গণমাধ্যমকর্মী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)এর প্রকল্প কর্মকর্তা ও সরকারি বেসরকারি সংস্থার কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *