সার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: গুদামে মজুদ, কৃষকের হাতে পৌঁছায় চড়া দামে
তাপস কুমার ঘোষ, কালিগঞ্জ : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের অনেক বেশি মূল্যে। কখনো সার নেই অজুহাত, আবার কখনো একাধিক শর্ত আরোপ করে বিক্রি এই বাস্তবতায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
রবিবার (০৪ জানুয়ারি) দিনব্যাপী অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিসিআইসি ও বিএডিসির সার বিতরণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী ডিলার সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সার বিক্রি করা হচ্ছে চড়া দামে, আর এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীকলা গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান জানান, চলতি বোরো মৌসুমে ডিএপি সার কিনতে গেলে অনুমোদিত ডিলার তাকে এক বস্তা সার দিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং সর্বোচ্চ ২০ কেজি দেওয়ার কথা বলা হয় এবং পুরো বস্তা নিতে হলে কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি লাগবে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে অন্য সার কিনতেও বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কালিগঞ্জের কুশলিয়া, কৃষ্ণনগর, মৌতলা, বিষ্ণুপুর, দক্ষিণশ্রীপুর, মথুরেশপুর, ধলবাড়িয়া, রতনপুর, ভাড়াশিমলা, নলতা, চাম্পাফুল ও তারালী প্রায় সব ইউনিয়নেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও সার না থাকার কথা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত দাম ও শর্তে বিক্রি করা হচ্ছে।
ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, একটি পরিবারের হাতে বিসিআইসি ও বিএডিসির একাধিক ডিলারশিপ থাকায় বাজার পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মৌতলা ইউনিয়নেও, যেখানে একাধিক ডিলারশিপ কার্যত একই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
কৃষকদের বড় অংশই সরকারি নির্ধারিত সারের মূল্য সম্পর্কে অবগত নন। এই সুযোগে ডিলাররা ইউরিয়া, ডিএপি ও পটাশ সার সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে সার কেনার সময় বীজ ও কীটনাশক কিনতেও চাপ দেওয়া হচ্ছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, কালিগঞ্জ উপজেলায় প্রতি ইউনিয়নে একজন ডিলার এবং প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে সাব-ডিলার থাকার কথা। অথচ বাস্তবে অনুমোদনহীন শতাধিক খুচরা সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যবসায়ীর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সার অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে, যার ওপর কার্যত কোনো নজরদারি নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাব-ডিলার জানান, এক ইউনিয়নে ট্রাকে করে আসা ৪০০ বস্তা ডিএপি সারের বড় অংশ ডিলারের গুদামেই মজুদ রাখা হয়। পরে সেই সার খুচরা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। এতে মাত্র এক ট্রাক সারের ক্ষেত্রেই কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দিন বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। কালিগঞ্জে কোনো সার সংকট নেই। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি উপজেলায় প্রকৃত সারের মজুত, একাধিক ডিলারশিপের বৈধতা কিংবা অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দেননি।
এই পরিস্থিতি সার ব্যবস্থাপনা আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন এবং সরকারি ভর্তুকি নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা বলছেন, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর অভিযান এবং দায়ী কর্মকর্তা ও ডিলারদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

